||অচেনা অন্তর ||
আমরা মানুষকে খুব সহজেই বিচার করে ফেলি। খুব সহজেই!
কারো মুখ একটু ভার দেখলেই বলে দিই— ছেলেটা বা মেয়েটা অহংকারী। কারো সামান্য একটু নীরবতা দেখলেই ভেবে নিই— ওর ভাব বেশি।
কাউকে একাকী থাকতে দেখলেই "অসামাজিক" বলে সিল মেরে দিই।
কাউকে রাত জেগে থাকতে দেখলেই প্রশ্ন করি— কী এমন কাজ করছে, যার জন্য সারারাত ঘুম নেই?
কেউ ভোরে বাড়ি ফিরলেই সন্দেহ করি— কোথায় ছিল সারারাত?
কিন্তু আমরা একটা প্রশ্ন খুব কমই করি— "কেন?"
জিজ্ঞেস করি না— সে কেন চুপ করে আছে?
কেন সে আগের মতো হাসে না?
কেন সে মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলে?
কেন রাত তার কাছে দিনের চেয়ে বেশি আপন?
কেন ভোরের স্নিগ্ধতায়ও তার চোখে ক্লান্তির কল্লোল দেখা যায়?
আমরা, মানুষেরা, সাধারণত মানুষের বাহ্যিক কাজ দেখি। কিন্তু সেই কাজের কারণ দেখি না।
আমরা মানুষের বাহ্যিক আচরণ দেখি। অথচ ভেতরের যুদ্ধটা দেখি না। আমরা মানুষের মুখ দেখি। হৃদয় দেখি না।
আসলে এটা অযৌক্তিকও না। মানুষের বাহ্যিক দিক দেখেই তো মানুষ বিচার করবে, আর স্রষ্টা অন্তর দেখে, হৃদয় দেখে, নিয়ত দেখেই বিচার করবেন। এটাই স্বাভাবিক।
তবু্ও ব্যাপারগুলো নিয়ে একটু ভাবার জন্যই লিখছি, এই আরকি!
যাই হোক, একজন মানুষ হয়তো সারাদিন আপনার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে। হাসছে। গল্প করছে। কাজ করছে। আপনিও ভাবছেন— বাহ! মানুষটা তো বেশ চমৎকার। অনেক ভালোই আছে লোকটা।
অথচ এর উল্টো পিঠও আছে, যা আপনি জানেন না।
যেই মানুষটাকে হাসতে দেখেন, গাইতে দেখেন— সেই মানুষটাই হয়তো রাতে একা ঘরে ফিরে নিজের সঙ্গে নিজেই যুদ্ধ করে। এই যুদ্ধ এমন ভয়ানক যুদ্ধ, যার সাথে কোনো অক্সিলিয়ারি ফোর্স থাকে না।
এই যুদ্ধের একমাত্র সঙ্গী হয়তো তার চোখের জল।
তবে এর চেয়েও দুর্ভাগা কিছু মানুষ আছে, যারা এই জলটুকুও ঝরাতে পারে না। তারা এতটাই কপালপোড়া যে, চোখ মেলে কাঁদতেও পারে না।
তাদের বুক ভেঙে তছনছ হয়ে যায়, কলিজাটা খানখান হয়ে যায়, তবুও চোখ দিয়ে দু-ফোঁটা জল নামাতে পারে না।
দমবন্ধ করা কষ্টের কোলাহল নিয়েই তাদের বসবাস।
বুকভাঙা আর্তনাদকে সঙ্গী করেই তাদের পথচলা।
সবকিছুর পরও তারা চুরমার হয়ে যাওয়া বুকটা নিয়ে চুপ হয়ে যায়।
এরা অভিযোগের ঝুলি নিয়ে ঘ্যানঘ্যান-ফ্যানফ্যান করে না। সত্যি বলতে তারা শুধুই চুপ হয়ে যায়, আর আস্তে করে দূরে সরে যায়।
কাউকে দোষ না দিয়ে অপরাধের কাঠগড়ায় নিজেকেই দাঁড় করিয়ে দেয়। তারপর নিজের অনুভূতির দরজাটা চিরতরে বন্ধ করে দেয়।
আর আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে সেই বন্ধ দরজাটা দেখে মস্তবড় বিচারকের মতো রায় দিয়ে দিই— লোকটা আগের মতো নেই, মানুষটা আপাদমস্তক বদলে গেছে।
হ্যাঁ, বদলে গেছে। মানুষটা সত্যিই বদলে গেছে।
কিন্তু কেন বদলেছে— সেই প্রশ্নটা কি কখনো করেছি আমরা?
হয়তো কোনো কিছু নিয়ে সে ভীষণ স্বপ্ন দেখেছিল, হয়তো সে কাউকে খুব ভালোবেসেছিল।
হয়তো সেই স্বপ্নই তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, কিংবা সেই ভালোবাসাই তাকে তছনছ করে দিয়েছে।
হয়তো সে কাউকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছিল, আর সেই বিশ্বাসই তাকে চোখে আঙুল দিয়ে শিখিয়ে গেছে— মানুষকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে নেই।
হয়তো সে একটা স্বপ্নের পেছনে সারাজীবন হেঁটেছে। ঝড় এসেছে, বৃষ্টি এসেছে, মানুষ হাসাহাসি করেছে— তবুও সে থমকে যায়নি, হেঁটে গেছে।
কিন্তু তার সেই স্বপ্নের পথে হাঁটতে চাওয়া পা দুটোকেই হয়তো কেউ নির্দয়ভাবে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে।
কিছু মানুষ তো বাস্তবতার কাছে হেরে গিয়েও স্বপ্নের কাছে হার মানতে চায় না।
কিন্তু তার সেই স্বপ্ন দেখার দরজাতেও যখন খিল এঁটে দেওয়া হয়, তখন সেই মানুষটা আর কোন অবলম্বন আঁকড়ে বাঁচবে?
আপনি তার স্বপ্ন দেখা নিয়ে তাকে পাগল বলতে পারেন। উদ্ভট বলতে পারেন, অতিরিক্ত আবেগী বলতে পারেন।
কিন্তু আপনি কখনও জানার চেষ্টাটুকুও করতে পারেন না— তার স্বপ্নটাই হয়তো তার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।
এই পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো— সে অন্য মানুষের দৃশ্যমান জীবনটাকেই তার সম্পূর্ণ জীবন মনে করে।
আপনি কাউকে হাসতে দেখলেন— ভাবলেন সে সুখী।
আপনি কাউকে চুপ থাকতে দেখলেন— ভাবলেন সে অহংকারী।
আপনি কাউকে দূরে সরে যেতে দেখলেন— ভাবলেন সে আপনাকে আর চায় না।
আপনি কাউকে রাত জাগতে দেখলেন— ভাবলেন তার কোনো দায়িত্ববোধ নেই।
অথচ মানুষ তার দৃশ্যমান রূপের চেয়েও অনেক বড়, অনেক গভীর! যে গভীরতা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।
প্রতিটি মানুষের একটা প্রকাশ্য জীবন আছে, আবার একটা গোপন জীবনও আছে।
প্রকাশ্য জীবনে সে আপনার সাথে কথা বলে; গোপন জীবনে সে নিজের সাথে কথা বলে।
প্রকাশ্য জীবনে সে হাসে; গোপন জীবনে সে ভেঙে পড়ে।
প্রকাশ্য জীবনে সে বলে— "আমি ভালো আছি।" কিন্তু গোপন জীবনে হয়তো সেই মানুষটাই প্রতিরাতে নিজেকে জিজ্ঞেস করে— "আমি আর কতদিন ক্লান্তির এই অগাধ সমুদ্রে সাঁতরে বেড়াব?"
তাই মানুষকে বিচার করার আগে একটু থামুন।
আপনি যে মানুষটাকে কঠিন ভাবছেন, সে হয়তো জীবনের কাছে বারবার নরম হতে গিয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।
আপনি যে মানুষটাকে উদাসীন ভাবছেন, সে হয়তো ভেতরে ভীষণ অনুভূতিশীল।
আপনি যে মানুষটাকে অদ্ভুত ভাবছেন, সে হয়তো এমন কিছু অনুভব করছে— যার ভাষা পৃথিবীর কোনো সাহিত্যে আজও লেখা হয়নি।
বিশ্বাস করুন আর নাই করুন— মানুষ কখনো অন্য মানুষের অনুভূতির গোপন আস্তানা চেনে না। কেউই কারো হৃদয়ের রঙ জানে না।
মানুষের মুখ পড়া সহজ, কিন্তু নীরবতা পড়া বড্ড কঠিন।
একজন মানুষের নীরবতার পেছনে অনুভূতির যে অগাধ সমুদ্র লুকিয়ে থাকতে পারে— তা বুঝতে হলে শুধু ডাগর ডাগর দুটো চোখ থাকলেই হয় না, একটা দরদী হৃদয়ও থাকা লাগে।
~রেদওয়ান রাওয়াহা
#উপলব্ধি

Comments
Post a Comment