দুর্দিনের দাম্পত্য





 ইদানীং ডিভোর্সটা যেন বাচ্চাদের খেলা হয়ে গেছে। জটিল সমীকরণ মেলাতে না পারলে কিংবা জীবনের ওপর একটু বাড়তি চাপ এলেই মনে হয়—থাক, এত এত ঝামেলার দরকার কী? আলাদা হয়ে যাই। নিজের মতো করে একটু আরামের জীবন কাটাই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ের মদিনা কিংবা মক্কার রোদে পোড়া পথগুলোতেও বিচ্ছেদ ছিল। সাহাবায়ে কেরামও ডিভোর্স দিয়েছেন, তাঁদের সম্মানিতা স্ত্রীগণও নিয়েছেন। কিন্তু সেই গল্পগুলোর আবহাওয়া ছিল একেবারে অন্যরকম।

কেউ হয়তো রাসুল (সা.)-এর কাছে গিয়ে সোজাসুজি বলেছেন, "ইয়া রাসুলুল্লাহ, লোকটা মানুষ হিসেবে ভালো, কিন্তু ওর চেহারাটা আমার পছন্দ হয় না। একসাথে থাকতে পারছি না।" রাসুল (সা.) হেসেছেন, শরিয়তের বিধান মেনে বিচ্ছেদের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কোনো জটিলতা নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই। খুব সহজ আর ঝরঝরে একটা ব্যাপার।

কিন্তু জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর কাজে নিবেদিত থাকার কারণে যে জুলুম আসে, সে জুলুমের ভয়ে কি কখনও তাঁরা ডিভোর্স নিয়েছেন?

চারপাশে প্রচণ্ড অত্যাচার, দ্বীনের পথে চলায় পদে পদে যন্ত্রণা, কাফেরদের রক্তচক্ষু— এইসব সয়ে টিকে থাকতে কষ্ট হচ্ছে বলে কি কোনো সাহাবিয়া স্বামীকে বিদায় জানিয়েছেন? কখনও কি তারা কেউ বলেছেন, "অনেক হয়েছে, আর না। এবার আমাকে একটু মুক্তি দাও, একটু নির্ঝঞ্ঝাট, শান্তিময় জীবন কাটাতে দাও"?

না। ইতিহাস খুঁজে এমন একটা গল্পও সম্ভবত আপনি পাবেন না।

আসলে, ঝামেলামুক্ত একচিলতে আরামের জীবনের চেয়ে তাঁদের কাছে ঈমানের দাম ছিল অনেক বেশি। অনেক!

তাদের ওপর যখন জুলুমের জোয়াল নেমে এসেছিল, অত্যাচার যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তখন তাঁরা ডিভোর্স ফরম হাতে নিয়ে বসেননি। তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন অন্য পথ—সবর, ইস্তেকামাত আর হিজরত।

তপ্ত মরুভূমির ওপর দিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে তাঁরা আবিসিনিয়ায় চলে গেছেন, মদিনায় ছুটে গেছেন। সেই অত্যাচারিত স্বামীর হাত ধরেই হেঁটেছেন মাইলের পর মাইল, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তবুও সংসার ভাঙেননি, হাল ছাড়েননি। বরং একসাথেই ঘর ছেড়েছেন ঈমানটুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

তাঁদের কাছে জীবনটা কোনো নির্ঝঞ্ঝাট ছুটি কাটানোর গল্প ছিল না। জীবনটা ছিল দীর্ঘ, (নিজেদের আদর্শের আলোকে) সুন্দর, অর্থবহ এক কঠিন যাত্রা। আর সেই যাত্রায় স্বস্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল—কার পাশে হেঁটে তাঁরা গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন!

অথচ আজকের দিনে দুঃসময় এলেই মানুষ মানুষের হাতটা কী নির্দ্বিধায়ই না ছেড়ে দেয়!

সুখের দিনে পাশে থাকার মানুষের অভাব হয় না, আলো ঝলমলে সকালে পথ চলার সঙ্গীরও কমতি থাকে না। কিন্তু ঝড়ের রাতে, যখন চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার আর চারপাশ থেকে বিপদের আঁচ এসে গায়ে লাগে— ঠিক তখনই বোঝা যায় কে সত্যি সত্যি হাতটা শক্ত করে ধরে সুখ-দুঃখ একসাথে সামলানোর জন্য এসেছিল, আর কে এসেছিল কেবল আলো ঝলমলে আবহাওয়া উপভোগ করতে।

রাজনীতি কিংবা কোনো আদর্শিক আন্দোলন—যেটাই হোক না কেন, যখন তা কারো জীবনে চরম সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যখন একটা মানুষকে নিজের আদর্শ আর বিশ্বাসের মূল্য দিতে গিয়ে দিনের পর দিন কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে সময় কাটাতে হয়, দুঃখের দহনে পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হতে হয়, তখন সেই কষ্টের ভার গিয়ে পড়ে তার পরিবারের ওপরও।

এই চরম দুঃসময়ে একজন মানুষ যখন সবচেয়ে বেশি আশা করে তার সবচেয়ে কাছের মানুষটির স্পর্শ, ঠিক তখনই যদি সেই হাতটি শিথিল হয়ে যায়, যদি জীবনসঙ্গী তাকে সেই নিবিড় নিঃসঙ্গতার অতলে ফেলে দিয়ে নিজের জন্য বেছে নেয় এক নিরাপদ আর আয়েশি জীবন, তবে সেই দৃশ্য কি হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি না করে পারে?

যেমন বাগেরহাটের এমপি রাহাদ ভাইয়ের কথাই ধরা যাক।

ভাই জামায়াতে ইসলামী করার কারণে (যেই সংগঠনকে সেই আন্দোলনের জনশক্তিরা "ইসলামি আন্দোলন" বলে মনে করেন, সেই ইসলামি আন্দোলন করার অপরাধেই) তাকে জেলে যেতে হয়েছে। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন গুজরান করতে হয়েছে, ফেরারি হয়ে আজ এখানে তো কাল ওখানে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। এক কথায় জালিমের জুলুমে এক কণ্টকময় জীবন অতিবাহিত করেছেন তিনি।

ইসলামি আন্দোলন করার অপরাধে তিনি যখন দুঃখের দহনে পুড়ে অঙ্গার হচ্ছেন, ঠিক তখনই ওনার স্ত্রী ওনার হাতটা ছেড়ে দিলেন। গ্রহণ করে নিলেন একটি আয়েশি আর নিরাপদ জীবন।

শুধু রাহাদ ভাইয়ের গল্পই যে এরকম, তা না। এমন অগণন বিষাদের বিষাক্ত বিষ আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।

 জামায়াতে ইসলামীর এক শীর্ষ শহীদ নেতার কন্যা— যিনি তার (এবং পরিবার) বাবাকে হারিয়ে এমনিতেই এক বিশাল কষ্টের মুখোমুখি, যখন তার চোখের জলল শুকায়নি— এমন সময় স্রেফ বাবার পরিচয়ের কারণে, জুলুমের আশঙ্কায় তাকেও কিন্তু তার সঙ্গী ভীষণ নির্দয়ভাবে ছেড়ে গেছে! 

অথচ সেই দারুণ দুঃসময়ে বোনটির হাতকে আরো বেশি শক্ত করে চেপে ধরার কথা ছিল তার, পরম মমতায় তাকে আগলে রাখার কথা ছিল।

যাই হোক, ডিভোর্স দেওয়া যেহেতু হারাম কিংবা বেআইনি কিছু নয়, তাই একে আইন বা শরিয়তের বিধানে সরাসরি অপরাধ বলে নিন্দাবাদ করা হয়তো যায় না। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় ঘনঘোর বিপদের সময় যে মানুষটি নিজের পার্টনারকে নিবিড় নিঃসঙ্গতায় ফেলে রেখে সটকে পড়ে— তার মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে কি একেবারেই প্রশ্ন তোলা যায় না?

আইনের খাতা শতভাগ নিখুঁত হলেও, যে ব্যক্তি বিপদের মুখে প্রিয়জনকে একা ফেলে কেবল নিজের নিরাপত্তার হিসেব কষে, তার ভেতরে 'ইনসানিয়াত' আর 'ইহসান'-এর বোধটুকু কতখানি অবশিষ্ট আছে, তা নিয়ে শঙ্কিত না হয়ে আসলেই কি কোনো উপায় থাকে? 

ঈমানের পরীক্ষায় কিংবা জীবনের চরম দুঃসময়ে সাহাবিরা কীভাবে একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে হিজরতের পথ পার হয়েছিলেন, সেই ইতিহাস আমাদের মুগ্ধ করে, অভিভূত করে। করে আপ্লুতও। 

অথচ আজকের দিনে নিজের একটু আরামের জন্য প্রিয় মানুষটার দুঃসময়ে তার সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে এভাবে দূরে সরে যেতে দেখলে বুক চিরে কেবল এই তীব্র আকুল আকুতিই বের হয়ে আসে— আল্লাহ যেন এমন দিন কারো জীবনে না আনেন। দুর্যোগ আর দুর্ভোগের দিনে সবচেয়ে আপন মানুষটাই যেন হাত ছেড়ে দিয়ে কাউকে একা ফেলে না চলে যায়।


~রেদওয়ান রাওয়াহা

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানিরা কি সত্যিই আমাদের মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চেয়েছিলো?

স্বপ্নে হলেও এসো একবার

বাইয়াত ও জামায়াত : বিভ্রান্তি ও সমাধান