নির্ভরতার নীড়





মানুষ খুঁজতে গেলে পারফেক্ট মানুষ খুঁজবেন না। পারফেক্ট মানুষ বলে কিছু নেই। 

যে দেখতে ভালো, তার মেজাজ খারাপ। যার মন ভালো, তার হয়তো কথা বলার ধরনটা খারাপ। কেউ খুব যত্নশীল, কিন্তু ভীষণ রাগী। কেউ আবার খুব শান্ত, কিন্তু তার ওপর ভরসা করা যায় না।

মানুষ এমনই।

তাই এমন একজন মানুষ খুঁজুন, যার কাছে গিয়ে আপনাকে অন্য একজন, ভিন্ন মানুষ সাজতে হয় না।

সারাক্ষণ কী বলছি, কী করছি, কীভাবে তাকাচ্ছি— এসব নিয়ে হিসাব করতে হয় না।

 মন খারাপ হলে চুপ করে থাকা যায়। ভুল করলে স্বীকার করা যায়। দুর্বল লাগলে দুর্বল হওয়া যায়। যার সামনে কাঁদতে গেলে লজ্জা লাগে না।

সুন্দর মানুষ দেখে ভালো লাগতেই পারে। রূপ দেখে মুগ্ধতা আসতেই পারে। বিত্তবৈভব দেখে আকর্ষণ ফিল হতেই পারে। 

প্রথম প্রথম সত্যিই এসব ভালো লাগে।

 তারপর দিন যায়, সময় গড়ায়। মানুষটা অসুস্থ হয়, মন খারাপ করে, রেগে যায়, টাকা-পয়সার টান পড়ে, সংসারে ঝামেলা হয়। তখন এই বাহ্যিক ব্যাপারগুলো সব আড়ালে চলে যায়, ফিকে হয়ে আসে; সামনে এসে দাঁড়ায় মানুষের আসল রূপটা, তার ভেতরের ব্যক্তিত্বটা।

আজকের দুনিয়ায় আমরা মানুষকে কতশত শর্ত দিয়ে মাপি। বাহ্যিক রূপ, পকেটের জোর, চালচলনের স্মার্টনেস, ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড৷ এডুকেশনাল কোয়ালিফিকেশন— এসব দেখতে দেখতে মূল যে শর্তটাই ভুলেই যাই, তা হলো— এই মানুষটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালে আমার ভেতরের অশান্ত মনটা কি শান্ত হবে?

পর্বতপ্রমাণ ভুল, অজস্র খামখেয়ালিপনা আর নানা রকম দুর্বলতা নিয়েই একটা জলজ্যান্ত মানুষ হয়। তাই দুনিয়ায় ‘পারফেক্ট’ বলে কিচ্ছু হয় না। আসলেই হয় না। 

সেজন্য পারফেক্ট মানুষ খোঁজার রোমাঞ্চ বাদ দিয়ে আমাদেরকে এমন কাউকেই খোঁজা উচিত, যার সান্নিধ্যে থাকলে অনাগত দিনের জীবনটাকে খুব বেশি ভারী মনে হবে না।

প্রথম দর্শনে চোখ ধাঁধানো মানুষ এই শহরে হাজারটা পাবেন। কিন্তু যে মানুষটার রূপ দেখে মুগ্ধ হলেন, কিছুদিন পর যদি দেখা যায় তার পাশে নিঃশ্বাস ফেলতেই ক্লান্তি আসছে— তখন সেই সৌন্দর্য ধুয়ে কি পানি খাবেন? 

যে মানুষটার সঙ্গে কথা বলার আগে দশবার ভাবতে হয়, মনের কথাগুলো মেপে মেপে, হিসেব করে বলতে হয়, সামান্য ফোন ধরতে না পারলেই যার কাছে কৈফিয়তের খাতা খুলে বসতে হয়, মন খারাপ করে চুপ করে থাকলেও যার কাছে বিরক্তির বন্যা হয়ে যেতে হয়, আর ভুল করলেই মনে হয় ঘরের ভেতর হাইকোর্ট বসেছে— সেই সম্পর্কের নাম ভালোবাসা হতে পারে না। এর সুন্দর কোনো সংজ্ঞা থাকতে পারে না। 

সেখানে মূলত ভালোবাসার চেয়ে ভয়টাই বড়ো হয়ে যায়। 

একবার কারো ভেতর ভয় ঢুকে গেলে মানুষটা তখন আর নিজের মতো করে আর বাঁচতে পারে না; সারাক্ষণ ভাবতে থাকে, কী করলে আবার কোনো ঝামেলা হবে না। কীভাবে চললে আর এমন দুঃসহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না।  

এমন পরিস্থিতিকে না বলা যায় সংসার, না বলা যায় ভালোবাসা! এটা বরং নিজেকে অনবরত ভালো প্রমাণ করে বসের কাছে রিপোর্ট দিয়ে যাওয়া এক দমবন্ধকর ২৪ ঘন্টার চাকরি।

তার চেয়ে অতি সাধারণ একটা মানুষ অনেক ভালো— যার সামনে কোনো ভাব মারতে হয় না। অযাচিত কোনো কৈফিয়ত দিতে হয় না। সারাক্ষণ ট্রায়ালের মুখোমুখি হবার ভয়ে তটস্থ থাকতে হয় না। রূপের জৌলুস প্রদর্শন করতে মেকাপের আড়ালে আসল রূপ লুকোতে হয় না। পকেটে টাকা না থাকলেও, শরীর অসুস্থ হলেও কিংবা ব্যর্থতার জীর্ণ-শীর্ণ রূপ নিয়েও যার সামনে নির্দ্বিধায় গিয়ে দাঁড়ানো যায়, বুকভরা ব্যথা নিয়ে প্রাণভরে দুটি শব্দ শেয়ার করা যায়। আক্ষেপ আর অনুতাপগুলো প্রকাশ করা যায়।  

যে মন খারাপের দিনে কোনো পণ্ডিতের মতো লেকচার দিতে আসবে না, কিংবা আপনাকে বদলানোর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জজ হয়ে বসবে না— শুধু পরম মমতায় এসে পাশে বসবে। প্রশান্তচিত্তে নির্ভরতাসমেত হাতটা ধরবে। এই চুপচাপ পাশে বসা আর বিচারক না হওয়াটাও কিন্তু মস্ত বড়ো আশ্রয়।

সাধারণত যেকোনো ধরনের সম্পর্কের আসল পরীক্ষাটা কিন্তু সুদিনে হয় না। 

যখন পকেটে টান পড়ে, মন চুরমার হয়ে থাকে, তখন বোঝা যায় কে পাশে আছে আর কে শুধুই তামাশা দেখছে।

 মতের অমিল হবে, ঝগড়াও হবে; কিন্তু যে মানুষটা রাগ করলেও অসম্মান করবে না, ভুল দেখলেও ছেড়ে যাওয়ার ভয় দেখাবে না, আর আপনার দুর্বলতা জেনে সেটা দিয়ে পরে আপনাকেই কুপোকাত করবে না— সে-ই আসলে সত্যিকারের সঙ্গী হবার মতো মানুষ।

আমরা তো বড়ো বাড়ি, দামি গাড়ি আর রাজকীয় অয়োজনের পেছনে ছুটি। অথচ দিন শেষে বাইরের সব ক্যাঁচক্যাচানি আর যুদ্ধ পার করে আমাদের শুধুই একটুখানি স্বস্তি প্রয়োজন। 

আমাদের সত্যিই এমন একটা জায়গা প্র‍য়োজন, যেখানে ভালো থাকার কোনো নাটক করতে হয় না, খারাপ থাকলেও অপরাধবোধে ভুগতে হয় না।

যার পাশে থাকলে বুক ধড়ফড় করার চেয়ে বরং অদ্ভুত এক শীতলতায় মনটা জুড়িয়ে যায়, যার পাশে নিঃসংকোচে বাঁচার স্বপ্ন দেখা যায়— তাকে খুব যত্ন করে আঁকড়ে রাখবেন।

কারণ সুন্দর মানুষ তো হাটে-বাজারেও মেলে...

কিন্তু মন শান্ত করার মানুষগুলো বিধাতা সম্ভবত মেপে মেপেই পাঠান।

 

~রেদওয়ান রাওয়াহা


Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানিরা কি সত্যিই আমাদের মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চেয়েছিলো?

স্বপ্নে হলেও এসো একবার

বাইয়াত ও জামায়াত : বিভ্রান্তি ও সমাধান