স্বপ্নে হলেও এসো একবার
প্রিয়জনহারা মনে কখনো প্রশান্তি থাকে? মনে হয়, থাকে না। আমারও নেই।
বিরহের জ্বালা কেউ সয়, কেউ সয় না; সইতে পারেও না। আমিও পারছি না!
বিরহ-বেদনায় ভারাক্রান্ত মনের কানন। সেই বিরহ-ব্যথা আমার হৃদয়কে, আমার অন্তরকে খুবলে খুবলে খাচ্ছে। দুঃখ-জ্বালায় আমি বিমর্ষ হয়ে পড়ছি।
আমি তোমাকে দেখতে চাই। তোমাকে দেখার খুব শখ আমার।
তোমাকে না দেখার ব্যথা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে!
তাই আমি শুধু তোমারই পথ চেয়ে থাকি। সেই পথ চেয়ে আমি কাঁদি। আমার দুটো নয়ন কাঁদে। আঁখিতে অশ্রু টলমল করে সরোবরের ন্যায়।
এই আমি তো সেই আমি, যেই আমি কখনো কারো জন্য এত পথ চেয়ে থাকিনি, এত এত পথ চেয়ে দেখিনি। এখনও দেখি না। কারো জন্য এত কাঁদিনি। এখনও না।
তবে, মাঝেমধ্যে কতোজনের জন্যেই তো কাঁদি। কতোভাবেই কাঁদি। সুখে কাঁদি, দুঃখেও কাঁদি। বিরহে কাঁদি। ব্যথায় কাঁদি।
মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমার এই মনটা সত্যিই যেন এক বিরহী ডাহুক। রাতভর বুকভরা অসহ্যসব কষ্ট আর কান্নারা এখানে ডাকাডাকি করে।
কখনও কখনও সেই কান্নার মাঝেও সুখ খুঁজে পাই। সেই যে সুখ, সেই সুখের মতো কান্নাটা কি সবারই ভালো লাগে?
সম্ভবত লাগে।
কারণ, সুখের মতো সেই কান্নায় হৃদয়টা নীরব হয়। পাতল হয়। হালকা হয়। হৃদয়ের অলিন্দে প্রশান্তি এসে আশ্রয় নেয়।
হৃদয়-বন্দরের দুঃখ-জ্বালাগুলো ক্ষণিকের জন্য হলেও প্রশমিত হয়ে যায়।
কেউ আমার জন্য, আমার কাছে স্বপ্নে এসে সাক্ষাৎ করুক, দেখা করুক—তা চাই না। চাইনি কখনও। কখনোই চাইতামও না। এখন চাই। খুব বেশিই চাই।
আমাকে চাইতে হয়। তোমার প্রেমের পরশ পেয়ে সিক্ত হতে চাই। হৃদয়ের শুকনো মরুভূমিটাকে ভিজিয়ে নিতে চাই।।
এই যে নিটোল সুন্দর এক স্বপ্ন, এই যে গভীর সুপ্ত একটা ইচ্ছে— এই ইচ্ছেটা তোমার জন্য। শুধুই তোমার জন্য! এখানে আর কারো জন্য সামান্যতম জায়গা নেই। বিন্দুসম স্থান নেই।
স্বপ্নে হলেও একটিবার দেখার যে ইচ্ছে, সেই ইচ্ছেটা জাগে প্রতিদিন। প্রতিটি মুহূর্তে। প্রতিটি ক্ষণে।
অবুঝ এই হৃদয়-বাগে তোমার প্রেমেরই শুধু আলোড়ন চলে। আর কারো জন্য না। কিছুর জন্যই না...
সাহারাসম তৃষ্ণা আমার এই ক্ষুদ্র বুকের গভীর ও গহীন গহ্বরে। আমার মনের সেই তীব্র তৃষ্ণা শুধুই তোমার জন্য। তোমার প্রেমে মশগুল থাকার জন্যে। তোমার ভালোবাসায় হৃদয়ের মণিকোঠাটা ভিজিয়ে রাখবার জন্যে।
আমি কেঁদে কেঁদে আমার রব্বের দুয়ারে ফরিয়াদ করি— আমি যেন তোমাকে কখনোই না ভুলি।
আমি তোমাকে ভুলতে চাই না, কখনোই না। কোনোভাবেই না!
আমি যদি তোমাকে ভুলে যাই— সেটাই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো পরাজয়। সবচেয়ে বড়ো!
আমি হতভাগাটা তো জীবনযুদ্ধে বারবার পরাজিত হই। বারবার পরাভূত হই।
আমি আর চাই না— পরাজিত হই, পরাভূত হই।
আমি এবার বিজয়মাল্য পরিধান করতে চাই। সেই বিজয়ের মালা পরিধান করতে আমি তোমাকে পেতে চাই। তোমাকে পেলেই আমি আমার আল্লাহ তা'আলাকে পাব। এভাবেই আমার জয়ের মালা গাঁথা হয়ে যাবে। এভাবেই আমি সাফল্যের সিড়ি উতরে যাব।
আমি গুণগুণ করে গাইতে থাকি, মিলোডি মাস্টার সাইফুল্লাহ মানসুরের গাওয়া একটা গান—
«আমি তো আমার চেয়ে তোমাকে
ভালোবেসে বেসে সারা হতে চাই।
পৃথিবীর সবকিছু হারালেও
তোমারে কভু যেন না হারাই।
আর কারো প্রেমে যেন ডুবে না মরি,
যায় যদি ভেঙে যাক জীবন-তরী!
তোমাকে পেলেই পাব আল্লাহ তা'লা,
এইভাবে গাঁথা হবে জয়েরও মালা...»
হৃদয়-বেতারে শুধু তোমার প্রেমেরই গান বাজে। বাজতেই থাকে অবিরাম, অবিরত। আমিও তা বাজতে দিই...
আমি তো তোমাকে কখনোই দেখিনি। তবুও কেন তুমি আমার স্মরণে আজও অমলিন হয়ে আছো?
কেন এই আমি শুধু তোমারই প্রেম চাই!
কেন শুধু তোমারই ভালোবাসা চাই?
কেন চাই— তোমার প্রেমের ফল্গুধারা আমার হৃদয়ে বয়ে চলুক! কেন!?
কী জন্যে শয়নে-স্বপনে, নিশীথে-জাগরণে শুধু তোমার ভালোবাসা মেখেই ধন্য হতে চাই?
কেন আমি অনেক বরষার বৃষ্টি ঝরিয়ে তোমার কাছেই আসতে চাই?
কেন অনেক ফুলের হাতছানি মাড়িয়েও তোমার ভালোবাসায় ধন্য হতে চাই?
সম্ভবত এটাই আমার ঈমানের দাবি।
তাহলে কি আজ আমি ঈমানের দাবিতে সত্যিই সত্যবাদী?
হয়তো, হতেও পারে।
কারণ, শুধু তোমার প্রেমের সাড়া পেলে আমি যদি পৃথিবীর সবকিছুও হারিয়ে ফেলি, এরপরও কোনো আফসোস থাকবে না।
হ্যাঁ, সত্যিই আমি তোমার জন্য পৃথিবীর সবকিছুই হারাতে পারি! এক্কেবারে সবকিছুই! এমনকি নিজের সবচেয়ে প্রিয় জীবনটাও! শুধুই তোমার জন্য। আর কারো জন্য না। কিছুর জন্য না।
আচ্ছা, আমি তো কুরআন পড়ি। আল-কুরআন খুলে দেখি। কুরআন খুলে আমি দেখি, আমার আল্লাহ বলেছেন—তুমিই আমার এবং আমাদের জন্য ‘শ্রেষ্ঠ আদর্শ’। [০১]
আমি পড়তে থাকি কুরআন। পাতার পর পাতা, সূরার পর সূরা। পড়তেই থাকি...!
এবার দেখি, আমার আল্লাহ বলেছেন—
“হে নবী, তুমি মহান চরিত্রের অধিকারী!”
এমন মহান, যেই মহত্তম চরিত্রের কোনো কূল-কিনারা নেই। [০২]
পড়তে পড়তে আরেকটা আয়াত পেয়ে যাই আমি। যেই আয়াতটা পড়ে হৃদয়টা আমার উৎফুল্ল হয়ে ওঠে, প্রশান্ত ও প্রশস্ত হয়ে ওঠে। আমার আল্লাহ বলেন—
“আমি আপনাকে সমগ্র জগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।” [০৩]
যেই মানুষকে শুধু আমার জন্য না, সারা বিশ্বের জন্যে রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন আমার রব্ব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা, তাঁর জন্য আমার ভালোবাসা থাকবে না— তা কী করে হয়!
তাঁকে আমি ভালোবেসে তাঁর রহমতের স্নিগ্ধতায় সিক্ত হব না—তা কীভাবে হয়? এ তো হতে পারে না। সম্ভব নয় যে!
আমার আল্লাহ সেই মহান মানুষটার সম্পর্কে বলেন—
“নিশ্চয় আপনি প্রেরিত রাসূলগণের একজন। সরল পথে প্রতিষ্ঠিত।” [০৪]
হাদিসের গ্রন্থ খুলতেই দেখি, উম্মুল মুমিনিন তথা মুমিনদের মা আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা তাঁর নিজ জীবনসাথি সম্পর্কে বলেছেন—
“পুরোটা কুরআনই আমার (প্রিয়তম-প্রিয়জন) রাসূলুল্লাহর চরিত্র।” [০৫]
হে প্রিয় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আমি আজ তোমার আদর্শে আলোকিত হতে চাই।
আমার আল্লাহ তো বলেছেনই, তোমার আনীত আদর্শই শ্রেষ্ঠ আদর্শ। তুমিই তো একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ— আমার জন্য, আমাদের জন্য।
আজ আমি তাই সেই আদর্শের আলোয় আলোকিত হতে চাই। সেই আলোর বন্যায় প্লাবিত হতে চাই। সেই অনিন্দ্য সুন্দর আদর্শ-অনুসরণে ধন্য হতে চাই।
সেই মহান এবং মহৎ মানুষের সাক্ষাৎ কত কত মানুষ তো স্বপ্নের মাঝেও পায়। অথচ আমি এই অথর্বটা পাচ্ছি না। কিন্তু আমি তো স্বপ্ন হলেও শুধু একটিবার দেখতে চাই তোমাকে। শুধুই একটিবার!
আমি যখন আখিরাতে মাগফিরাত চেয়ে চেয়ে কাঁদব, তখন তোমার শাফায়াতই তো আমাকে মুক্তি দেবে।
কেউই যখন আমাকে চিনবে না, স্বয়ং আমার গর্ভধারণকারী মা-ও যখন আমাকে চিনবেন না, আমার দিকে ফিরে তাকানোর ফুরসতও যখন তিনি-সহ কারোই থাকবে না— এহেন সেই অসহায় মুহূর্তে, আমি যখন হন্য হয়ে ছুটোছুটি করে বেড়াব, তখন তো তুমিই আমার আশ্রয় হবে। তুমিই তো আমার জন্য শাফায়াত করবে। আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে আমার জন্য মাগফিরাত চাইবে তো তুমিই। এ কথা তো হাদিসের পাতাতেই পড়ে এসেছি। [০৬]
যেই মানুষটার মাঝে আমাকে নিয়ে এত দরদ, যিনি তাঁর উম্মতের জন্য এত মায়াবী আর প্রেমময়, যার আচরণ সহকর্মী ও অধস্তনদের জন্য এত উন্নত, এত অনুপম; আর দেখতেও যেই মানুষটার সৌন্দর্য হার মানায় পূর্ণিমার স্নিগ্ধ জোছনার মায়াবী আলোকেও— এমন একজন মানুষের কথা কেবলই শুনেছি, শুধুই শুনেছি!
তাঁর সৌন্দর্যের কথা শুনেছি, তাঁর মমতার কথা শুনেছি, তাঁর অনুপম চরিত্রের কথা শুনেছি। কিন্তু তাঁকে দেখিনি— কখনোই না, কোনোভাবেই না।
ছোট্ট এই হৃদয়ে এর চেয়ে বড়ো শূন্যতা, এর চেয়ে বড়ো হাহাকার আর কী হতে পারে?
তাই আজ শুধু আমি না, তাঁকে দেখার জন্য, তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য সবাই কাঁদে। সারা দুনিয়া কাঁদে। গোটা ভুবন কাঁদে!
এমন একজন মানুষের জন্য কার না কান্না আসবে?
কে না এমন মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হতে চাইবে?
এমন মানুষের প্রেমের পরশে কোন মানুষটা তার হৃদয়কে উজালা করতে না চাইবে?
মনে পড়ে গেলো মু’তার যুদ্ধের প্রথম শহীদ সেনাপ্রধান, হিব্বু রাসূলিল্লাহ (রাসূলুল্লাহর প্রীতিভাজন) উপাধিযুক্ত যায়িদ বিন হারেসা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘটনা।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে লালন-পালন করেছেন। তাঁকে তাঁর পিতা-মাতার ভালোবাসাও নবী করিম (সা.)-এর ভালোবাসার কাছে টলাতে পারেনি।
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর স্ত্রী খাদিজাতুল কুবরা (রা.) এই যায়িদকে হাদিয়া দিয়েছেন।
বালক যায়িদ তাঁর মহান সাহচর্য লাভ করে উত্তম আর শ্রেষ্ঠ চারিত্রিক সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেলেন।
এদিকে তাঁর মা পুত্রশোকে অসম্ভব অস্থির! মায়ের ভালোবাসা সন্তানের জন্য কেমন হয়, তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না!
পুত্রশোকে মা মুহ্যমান! মায়ের রজনীর সুগভীর সুষুপ্তি হারাম হয়ে গিয়েছে এই পুত্রশোকে!
একদিন যায়িদ (রা.)-এর পিতা হারিসা ছেলের সন্ধান পেয়ে গেলেন। হারিসা ছেলেকে ফেরত আনার জন্য সফরের প্রস্তুতি নিলেন। কলিজার টুকরো, নয়নের মণি সন্তান যায়িদের মুক্তিপণের অর্থও বাহনে উঠালেন। সফরসঙ্গী হিসেবে সাথে নিলেন হারিসার ভাই কা’বকে।
তাঁরা মক্কার পথে চলতে লাগলেন, বিরামহীন। অবিরত। একপর্যায়ে প্রিয় নবীজি মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহর কাছে পৌঁছলেন এবং বললেন—
‘ওহে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! আপনারা আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশী। অসহায়ের সাহায্যকারী, ক্ষুধার্তকে অন্নদানকারী ও আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয় দানকারী। আপনার কাছে আমাদের যে ছেলেটি আছে, তার ব্যাপারে আমরা এসেছি। তার মুক্তিপণও সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন এবং আপনার ইচ্ছামত তার মুক্তিপণ নির্ধারণ করুন।’
মুহাম্মাদ (সা.) বললেন, ‘আপনারা কোন ছেলের কথা বলছেন?’
— ‘আপনার দাস যায়িদ ইবন হারিসা।’
— ‘মুক্তিপণের চেয়ে যদি উত্তম কিছু আপনাদের জন্য নির্ধারণ করি, তা কি আপনারা চান?’
— ‘কী তা?’
— ‘আমি তাকে আপনাদের সামনে ডাকছি। স্বেচ্ছায় সে তা নির্ধারণ করুক—আমার সাথে থাকবে, না আপনাদের সাথে চলে যাবে।
যদি আপনাদের সাথে যেতে চায়, মুক্তিপণ ছাড়া তাকে নিয়ে যাবেন। আর আমার সাথে থাকতে চাইলে আমার তো আর করার কিছুই নেই।’
তারা সায় দিলেন। বললেন, ‘আপনি অত্যন্ত ন্যায়বিচারের কথা বলেছেন।’
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়িদকে ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন—
‘এ দু’ব্যক্তি কারা?’
যায়িদ বলল, ‘ইনি আমার পিতা হারিসা ইবন শুরাহবিল। আর উনি আমার চাচা কা’ব।’
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি ইচ্ছা করলে তাঁদের সাথে যেতে পারো, আর ইচ্ছে করলে আমার সাথেও থেকে যেতে পারো।’
কোনো রকম ইতস্তত না করে সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলে উঠলেন, ‘আমি আপনার সাথেই থাকব।’
তাঁর পিতা বললেন, ‘যায়িদ, তোমার সর্বনাশ হোক! পিতা-মাতাকে ছেড়ে তুমি দাসত্ব বেছে নিলে?’
তিনি বললেন, ‘এ ব্যক্তির মাঝে আমি এমন কিছু দেখেছি, যাতে আমি কখনোই তাঁকে ছেড়ে যেতে পারি না।’ [০৭]
কী এক অদ্ভুত মায়া-ভালোবাসা, স্নেহ আর উত্তম আচরণ পেলে একটা বালক তাঁর বাবা-মাকেও ছেড়ে থাকতে পারে— ভাবা যায়!
আমার তো যায়িদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মতো এত বিরাট সৌভাগ্য হয়নি— সেই মহান মানুষের সাহচর্য পেয়ে ধন্য হবার, খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখার। তাঁর পাশে বসার, তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার। তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য সরাসরি শোনার।
আর সেই আক্ষেপের জায়গা থেকেই, সেই না-পাওয়ার হাহাকার থেকেই আমি প্রায়শই গানের ভাষায় বলে যাই—
স্বপ্নে হলেও এসো একবার...!
কারণ, বিশুদ্ধ হাদিসে তো পড়েই এসেছি—তিনি বলেছেন,
“যে আমাকে স্বপ্নে দেখেছে, সে সত্যিই আমাকে দেখেছে।” [০৮]
তাই তো আমার এই অযোগ্য হৃদয়টুকুও আজ স্বপ্ন দেখার সাহস করে।
দুনিয়ার এই চোখে তাঁকে সরাসরি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি— হবেও না। তাঁর পাশে বসার সৌভাগ্য হয়নি, তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু স্বপ্নের দুয়ার তো এখনও বন্ধ হয়ে যায়নি!
তাই কোনো এক নিঃশব্দ রাতে, যখন পৃথিবীর সব কোলাহল থেমে যাবে, যখন আমার দুটো অশ্রুসিক্ত চোখ ঘুমের কাছে আত্মসমর্পণ করবে— তখন যদি তিনি এসে দাঁড়ায় আমার স্বপ্নের দুয়ারে!
আমি হয়তো কোনো কথা বলতে পারব না।
হয়তো শুধু তাকিয়ে থাকব।
বুকের ভেতর জমে থাকা এতদিনের অপেক্ষা, এতদিনের বিরহ, এতদিনের আকুলতা—সবকিছু হয়তো অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়বে।
হয়তো কাঁদতে কাঁদতে শুধু এটুকুই বলতে পারব—
“হে আল্লাহর রাসূল! এতদিনে তোমাকে দেখলাম!”
তারপর আর কিছু চাইব না।
শুধু চাইব— সেই স্বপ্নটা যেন শেষ না হয়। সেই দেখা যেন ফুরিয়ে না যায়। সেই একটুখানি মুহূর্ত যেন আমার সমস্ত জীবনের না-পাওয়ার কষ্টকে ধুয়ে-মুছে নিয়ে যায়।
আর যখন ঘুম ভেঙে যাবে, যখন দেখব— তিনি নেই, চারপাশে শুধু নিঃসঙ্গ সকাল; তখনও হয়তো চোখের কোণে অশ্রু থাকবে। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে থাকবে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। মুখেও হয়তো ফুটে উঠবে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি।
কারণ, তখন অন্তত বলতে পারব— আমি তাঁকে দেখেছি। হয়তো স্বপ্নে। তবুও দেখেছি তো!
হয়তো এক মুহূর্তের জন্য। তবুও দেখেছি তো!
আর সেই একটিমাত্র দেখা হয়তো আমার এই অশান্ত হৃদয়ের জন্য হয়ে থাকবে— রব্বের পক্ষ থেকে পাওয়া সবচেয়ে সুন্দর আর শ্রেষ্ঠ উপহার।
তাই আজও আমার রব্বের দরবারে একটাই ফরিয়াদ—
হে আল্লাহ! আমার এই ভালোবাসাকে কবুল করো। আমার এই অশ্রুগুলোকে কবুল করো। আমার এই আকুলতাকে কবুল করো। আমার হৃদয়কে তোমার প্রিয় হাবিবের ভালোবাসায় এমনভাবে ভরিয়ে দাও, যেন দুনিয়ার কোনো মোহ আমাকে তাঁর আদর্শ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরিয়ে নিতে না পারে।
আর যদি আমার এই অশ্রুভেজা আকুতি তোমার দরবারে কবুল হয়—
তবে হে আমার প্রিয় রাসূল, স্বপ্নের সেই নিঃশব্দ দুয়ারটায় একবার এসো।
আমি অপেক্ষায় থাকব—
চোখের পাতা মেলে,
হৃদয়ের দুয়ার খুলে,
অশ্রু নিয়ে,
ভালোবাসা নিয়ে।
তবুও এসো। একটিবার এসো। স্বপ্নে হলেও এসো। শুধু একটিবার...!
|| স্বপ্নে হলেও এসো একবার...||
~রেদওয়ান রাওয়াহা
[ লেখাটি ফেসবুকের মিম্বার গ্রুপের ২০২০ সালের অক্টোবরে, সিরাত প্রতিযোগিতায় লিখেছি। লেখাটি পুরস্কার প্রাপ্ত। কেন পুরস্কারপ্রাপ্ত জানি না। সম্ভবত আবেগের দিক বিবেচনায় হতে পারে।]
-----
রেফারেন্স
[০১] সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ২১
[০২] সূরা আল-ক্বালাম, আয়াত: ০৪
[০৩] সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭
[০৪] সূরা ইয়াসিন, আয়াত: ০৩–০৪
[০৫] সহীহ মুসলিম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৭৪৬
[০৬] সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৪৭১২
[০৭] আসহাবে রাসুলের জীবনকথা, প্রথম খণ্ড — ড. আব্দুল মাবুদ
[০৮] সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৬৫৯২
[০৯] লেখাটি গীতিকার ও সুরকার মাওলানা তারেক মনোয়ারের কয়েকটি না'তে রাসুল থেকে অনুপ্রাণিত।

ইনশাআল্লাহ,আপনার স্বপ্ন পূরণ হবে একদিন।চেষ্টা চালিয়ে যান।
ReplyDeleteলেখাগুলো পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো নিজের মনের কথা গুলো পড়ছি😊।
আল্লাহ আপনার লেখায় বারাকাহ দান করুন😊।
আমীন
Deleteএতো আবেগ মিশ্রিত লেখা খুব কম-ই পড়েছি। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে যেই 'উত্তম আদর্শ' এর আমরা সেই আদর্আশে যেন বলীয়ান থাকতে পারি। আমাদের , আমার, আমাদের ভালোবাসার প্রিয় রসূল সা. কে দেখার স্বপ্ন পূরণ হোক। (আমিন)
ReplyDelete