আগামীর যুদ্ধ হবে সুপেয় পানির যুদ্ধ
আগামীর যুদ্ধ হবে সুপেয় পানির যুদ্ধ - কথাটা কে জানি বলেছিল কয়েক যুগ আগে। আজকে ইরানের ওয়াটার ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে হামলা করে বিশ্বকে কি ঐদিকে নিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা?
এখন ইরানও হুমকি দিয়েছে যে, "কাজটা আমরা শুরু করি নি"। মানে, এখন আমরাও করব। কোথায় করবে? নিশ্চয়ই মিডল ইস্টের এরকম ওয়াটার প্ল্যান্টগুলোতে। তারপর কি হবে? কোটি কোটি মানুষ সুপেয় পানির অভাবে কষ্ট পাবে। কত বড় ডিজাস্টার হবে এটা!!!!
রাশিয়ার বৈকাল হ্রদ যদি ভূমির ওপরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুপেয় পানির ভান্ডার হয়, এই বেঙ্গল বেসিনও ভূমির নিচে বড় পানির ভান্ডার। এদেশের এই মহামূল্যবান সম্পদ কিসে অপচয় হয় জানেন?
ঐ যে কৃষকের বাচ্চাগুলারে দর্জিগিরি শিখিয়ে আধুনিক নীলচাষ শুরু করেছে, সেখানেই ওয়াশিংয়ে আমাদের পানিগুলোকে নষ্ট করা হয়।
এদিকে এই গার্মেন্টসের সামান্য জিএসপি সুবিধার বিনিময়ে পুরো দেশটা বেচে দিয়েছে ইউনুস। এবং ইউনুসকে সাপোর্ট করেছে বিএনপি ও জামাত। খলিলুর রহমানের বক্তব্যের প্রতিবাদ কেউ করেছে?
তারমানে সে ঠিকি বলেছে।
বাংলার ইতিহাসে একসময় ছিল নীলচাষ। জমির মালিকানা কৃষকের, কিন্তু ফসলের মালিক ছিল ব্রিটিশ কোম্পানি। কৃষক নিজের জমিতে নিজের খাদ্য ফলাতে পারত না; তাকে জোর করে নীল চাষ করানো হতো।
দুই শতাব্দী পরে দৃশ্যপট পাল্টেছে—নীলের জায়গায় এসেছে রেডিমেড গার্মেন্টস। তবে ব্যঙ্গাত্মক সত্য হলো, শোষণের যুক্তিটা খুব একটা বদলায়নি; শুধু কৃষকের মাঠ থেকে শ্রমিকের সেলাই মেশিনে স্থানান্তর হয়েছে।
বাংলাদেশে এখন প্রায় ৫০ লাখ মানুষ সরাসরি গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পে কাজ করে।
এই শিল্প দেশের মোট রপ্তানির ৮০–৮৫ শতাংশেরও বেশি জোগান দেয় এবং অর্থনীতির বড় স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
কাগজে-কলমে এটা উন্নয়নের গল্প। কিন্তু গ্রামের কৃষকের চোখে এটি কখনো কখনো এমন এক গল্প, যেখানে তার ছেলে আর লাঙল ধরে না—ধরে সেলাই মেশিনের প্যাডেল।
বাংলাদেশে কৃষি এখনও মোট কর্মসংস্থানের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষের জীবিকার উৎস।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, গ্রামের বহু তরুণ ধানক্ষেত ছেড়ে ঢাকায় বা গাজীপুরে গিয়ে গার্মেন্টসে কাজ করছে। ফলে এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি হয়েছে, যে দেশ একসময় “ধান-নদী-খালের দেশ” ছিল, সেই দেশের কৃষকের সন্তান আজ “কাটিং-লাইন-ফিনিশিং” বিভাগের কর্মচারী। কৃষি জমি পড়ে থাকে, আর শহরের কারখানাগুলো রাতদিন আলো জ্বেলে বিদেশের জন্য জামা বানায়। যার ৭০% প্রফিট যায় বিদেশিদের পকেটে। কেবল শ্রমিকের ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের বেতনের অংশ মেরে দিয়ে ধণী হয় কিছু লোক যারা দালালী করে এই দেশকে অন্ধকারে নিয়ে যাচ্ছে।
এই শিল্পের আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক হলো পানি। কাপড় ধোয়া, রং করা এবং ওয়াশিং প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ পানি লাগে। ১ কেজি ডেনিম কাপড় প্রক্রিয়াজাত করতে প্রায় ১৫০–২০০ লিটার পানি লাগে, কখনো কখনো ২৫০ লিটার পর্যন্তও লাগে।
ফলে গার্মেন্টস শিল্প বছরে প্রায় ১৫০০ বিলিয়ন লিটার ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে।
এটা এমন এক পরিমাণ পানি, যা ঢাকার কোটি মানুষের মাসের পর মাসের পানির সমান। তাই শিল্পাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে বলে গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।
ব্যঙ্গের এখানেই শেষ নয়। যে পানি দিয়ে বিদেশিদের জন্য ফ্যাশনের জিন্স ধোয়া হয়, সেই পানি আবার রং-রাসায়নিক মিশে নদীতে ফিরে আসে। অনেক জায়গায় বর্জ্য পরিশোধন ঠিকমতো না হওয়ায় ভারী ধাতু ও রাসায়নিক নদী-খালে চলে যায়।
ঢাকার শিল্প এলাকা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য পানি নদীতে পড়ছে—যার বড় অংশ আসে ওয়াশিং ও ডাইং কারখানা থেকে।
অর্থাৎ যে নদী একসময় কৃষকের জমিতে সেচ দিত, এখন সেই নদীই কারখানার রঙিন রাসায়নিক বহন করে। বিল - খালের মাছ তো কবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ক্ষতিকর খাদ্য খাইয়ে বড় করা চাষের মাছ খেতে হয়। আর এত দূষণের পর এদেশে এখন ঘরে ঘরে ক্যান্সার। আমার আম্মাও যার একজন। 😪😪😪
এই বাস্তবতায় “উন্নয়ন” শব্দটি এক অদ্ভুত নাটকীয় চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে কৃষকের ছেলে শহরে এসে সেলাই মেশিন চালায়, অন্যদিকে সেই কারখানার জন্য গ্রামের পানির স্তর নিচে নামে, নদী দূষিত হয়, মাছ কমে যায়।
এটাকে আমি তাই “আধুনিক নীলচাষ” নাম দিলাম। ব্রিটিশরা কৃষকের জমিতে জোর করে নীল চাষ করাতো, আজ কৃষকের সন্তানকে শহরে এনে বৈশ্বিক ফ্যাশনের জন্য জামা বানানো হয়। তখন ইউরোপ নীল রং নিত, এখন নেয় জিন্স আর টি-শার্ট। তখন জমি ক্ষতিগ্রস্ত হতো, এখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভূগর্ভস্থ পানি আর নদী।
ইতিহাসের অদ্ভুত কৌতুক হলো—দুই যুগের ব্যবধানেও গল্পের কাঠামো প্রায় একই রয়ে গেছে:
একদিকে বিদেশি বাজারের চাহিদা, আর অন্যদিকে বাংলার মাটি ও মানুষের নীরব মূল্য।
~রাহেল রহমান

Comments
Post a Comment