“ভাঙন থেকে পুনর্গঠন”
কী সুন্দর করে সাজানো-গোছানো মনটা কখনো না কখনো ভেঙে যায়। কেউ না কেউ ভেঙে দেয়। আমরা চাই না এমনটা হোক। কিন্তু তবুও এমনটাই হয়।
প্রায়শই এমন অগণিত অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হই। অথচ আমরা চাই না উত্তপ্ত উনুনে জ্বলে ওঠা অনলের মতো দাউদাউ করে আমাদের ভেতরটা জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হয়ে যাক।
কিন্তু আমরা না চাইলেও তা হয়, আমাদের এই ছোট্ট মনটা ঠিকই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে ভেঙে পড়েই। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়, খানখান হয়ে দুমড়ে-মুচড়ে থেঁতলে যায়।
বুকের খাচায় দুঃখের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। সেই দাবানল সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। বিষণ্ণতার কালো মেঘে ঢেকে যায় আমাদের আমাদের মন-আকাশ।
তখন আর কিছুই ভালো লাগে না। জগত-সংসার, পরিবারপরিজন, খাওয়া-দাওয়া, পড়াশোনা, কাজকর্ম— কিছুই না। কিছুতেই মন বসে না।
ভালো কথাও তেতো লাগে। পুরো দুনিয়াটাই অসহ্য মনে হয়।
কখনও কখনও তো এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আগ্রহটাই ক্ষয়ে যায়। ধৈর্যের দেয়ালটা ভেঙে চুরচুর হয়ে যায়। খসে খসে মাটিতে পড়ে একাকার-ম্যাসাকার হয়ে যায়।
ঠিক তখনই নিজেকে হুট করে প্রশ্ন করি— এত অধৈর্য হয়ে লাভটা কী? সহ্যের সীমা ডিঙিয়ে অসহ্যের আঁকাবাঁকা পথে গিয়ে এই ক্ষুদ্র জীবনটাকে দুর্বিষহ করে তোলার মানেটাই বা কী?
নিজেকেই এভাবেই বুঝাই।
বারংবার বুঝাই।
নিজেকে নিজেই বুঝিয়ে বলতে থাকি— ধৈর্য কোনো দুর্বলতার নাম নয়। ধৈর্য হলো ভেতরের সবচেয়ে শক্ত পেশি।
সম্ভবত গ্রিক দার্শনিক এপিকটেটাস বলেছেন—
“Man is not disturbed by things, but by the views he takes of them.”
এই উপলব্ধির এক অপরিসীম উৎস আমি পাই পবিত্র কুরআনুল কারিমে। সেখানে আল্লাহ যেন সরাসরি আমাকেই সম্বোধন করে বলেছেনন— “হে ঈমানদারগণ! তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে আমার কাছে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন।” ( আল-কুরআন, ২:১৫৩)
কী গভীর এই ঘোষণা! আল্লাহ নিজেই বলছেন— তিনি আমার সাথে আছেন। শর্ত একটাই— আমি যেন ধৈর্য ধারণ করি।
আবার আমাদের প্রিয়নবী, রাসূলুল্লাহ ﷺও বলেছেন—
“মুমিনের ব্যাপারটি সত্যিই আশ্চর্যজনক। তার সব অবস্থাই কল্যাণকর। সুখ এলে সে কৃতজ্ঞ হয়, তা তার জন্য কল্যাণ। দুঃখ এলেও সে ধৈর্য ধারণ করে, সেটাও তার জন্য কল্যাণ।” (সহিহ মুসলিম)
এসব যখন সামনে এসে হাজির হয়, তখন বুঝি— আসলে আমার ভেঙে পড়া, আমার কষ্ট পাওয়া; কিছুই অর্থহীন নয়। আমার কান্নাও বৃথা নয়।
এই ভাঙনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে নতুন করে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—
“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।”
এই যে একলা চলা, এই একলা চলার শক্তিটাই তো সবর।
সম্ভবত ইমাম গাজ্জালীও (রহ.) বলেছিলেন—
“ধৈর্য হলো এমন এক আলো, যা ছাড়া ঈমানের পথ অন্ধকার।”
তাহলে আমি কেন আল্লাহর এই স্পষ্ট নির্দেশ উপেক্ষা করব?
কেন সবর ও সালাতের এই নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে দিয়ে হাহাকার করব?
কোন উদ্দেশ্যে? কোন লাভে?যেখানে আল্লাহ স্বয়ং আমার সাথে আছেন, যেখানে তিনি নিজেই আমার বেদনার নিরাময়ের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন!
আমার তো কাজ একটাই— দাঁতে দাঁত চেপে ধৈর্য ধরা।
সিজদায় নত হয়ে শক্তি চাওয়া। সাহসের প্রবর্তনায় সামনে এগিয়ে যাওয়া। ভাঙা মনটাকে পুনরায় গড়ে তোলার প্রার্থনা করা।
আমি মুমিন। আমি বিশ্বাসী। তাই আমি বিশ্বাসকরি— আল্লাহ কখনও তার বান্দাকে পরাজিত করার জন্য ভাঙেন না। তিনি ভাঙেন— আমাদেরকে আরও দৃঢ়, আরও শক্তিশালী, আরও সাহসী করে গড়ার জন্য।
~রেদওয়ান রাওয়াহা
#নিজেকে_নাসীহা

Comments
Post a Comment