জিহাদ বনাম গণতন্ত্র: একপাক্ষিক ন্যারেটিভের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা
০১. বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য বা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য কত মানুষ, কতভাবেই না ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আমরা কি তা জানি না? অবশ্যই জানি। কারণ, এগুলো আমাদের সামনেই হয়েছে। তবুও আমরা এসব কারণে গণতন্ত্রকে বাদ দিতে বলি না। গণতন্ত্রকে উচ্ছেদ করতে বলি না।
বরং, আরও পিউর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে বলি। এই ইউটোপিয়ান পিউর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বছরের পর বছর ধরে সংগ্রাম করি। মার খাই, জেইলে যাই। বন্দি হই। নির্যাতিত ও নিপীড়িত হই।
গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পেট্রোল বোমা দিয়ে, গাণ-পাউডার দিয়ে বাস-ট্রাক, মোটরসাইকেল, বাড়িঘর, দোকানপাট— কতো কিছুই তো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি মানুষকে পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। খুন করা হয়েছে। তবুও আমরা এগুলোর জন্য গণতন্ত্রকে দোষারোপ করি না।
এগুলো কারার কারণে কাউকে গণতান্ত্রিক সন্ত্রাস বলি না। মনে হয় যেন, গণতন্ত্রে কোনো সন্ত্রাস হতে পারে না। সন্ত্রাস শুধু ইসলামের পক্ষের কিছু লোকজনই হতে পারে।
আপনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য মারবেন-মরবেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। ওই অর্থে এটা কিন্তু খুব বড়ো ভুল বা বড়ো সমস্যা না।
কিন্তু, আপনি দেখবেন, এখন ইসলামের জন্য যদি কিছু মানুষ ভুলভ্রান্তি করে, তখন ইসলাম মানেই সন্ত্রাস হয়ে যাবে। প্র্যাক্টিসিং মুসলিম মানেই উগ্রবাদী হয়ে যাবে। হয়ে যাবে দমনযোগ্য।
অথচ, গণতন্ত্রের জন্য সন্ত্রাস করলে, গণতন্ত্রের জন্য সহিংসতা চালালে, সেটা আর অন্যসব গণতান্ত্রিক দল বা সংগঠনকে দমনযোগ্য করে তোলে না। চাপে ফেলে দেয় না অন্যসব লিবারেল ডেমোক্রেটদেরকে।
কিন্তু, ইসলামের পক্ষের লোকজন কিছু ভুলভ্রান্তি বা অপরিনামদর্শী কোনো কাজ করলে, সেটা সব ইসলামপন্থীকেই চাপে ফেলার জন্য যথেষ্ট। শুধু চাপ না, নিপীড়ন করার জন্যও যথেষ্ট। এমনকি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাজ করা সংগঠনগুলোকেও এটা সাফার করতে হয়।
০২. ইসলামের ফরজ বিধান জিহাদ। জিহাদ নিয়ে কুরআনের অজস্র আয়াত আছে, রাসূলে আকরাম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অগণিত,অগণিত হাদিস আছে, এই জিহাদের কথা বলা এখন হয়ে যায় সন্ত্রাস!
আমার আরাকান, কাস্মীর, ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম ভাইবোনকে খুন করা হচ্ছে, অথচ, আমি বা আমরা তাদের পক্ষ হয়ে জিহাদের কথা বলতে পারব না। কাউকে সেসব জিহাদে সুযোগ থাকলে অংশগ্রহণ করতেও বলতে পারব না। পাছে আবার সন্ত্রাসী-জঙ্গি-উগ্রবাদী ট্যাগ পেয়ে যাই না-কি!
আবার, কিছু ব্যক্তি বা সংগঠনের, জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ নিয়ে ভুল পদক্ষেপ কিংবা ভুল সময়ে ভুলভাবে জিহাদ শুরু করতে চাওয়া কিংবা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর কথা বলে অযথা ফ্যান্টাসি করা বা এই বিধান ভুল পন্থায় পালনের কাজ করার ইফেক্ট কিন্তু সব ঘরনার মুসলমানদেরই পোহাতে হয়। যদি তারা এসব ভুল পদক্ষেপের বিরোধীও হয়, তবুও। পাশাপাশি চালানো হয় জিহাদ নিয়ে সম্মিলিত প্রোপাগাণ্ডাও।
কিন্তু, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করলে কিংবা ভুল পন্থায় আন্দোলন করার জন্য অন্য সকল গণতান্ত্রিক মানুষকে, সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও দলকে দোষারোপ করা হয় না। গণতন্ত্র বিরোধী এপ্রোচ গ্রহণ করা হয় না। এই ক্ষেত্রে গণতন্ত্র কিংবা লিবারেলিজম ও সেক্যুলারিজমকে মুক্তি দেওয়া হয়। দেওয়া হয় ছাড়পত্র।
০৩. ইসলাম জিহাদের কিছু শর্ত দিয়েছে, কিন্তু যারা সেই শর্ত এবং পারিপার্শ্বিকতা খেয়াল না করে জিহাদ নিয়ে ফ্যান্টাসি করে, আমি তাদেরও বিরোধিতা করি। তবে, তারা যতক্ষণ পর্যন্ত অন্যায়ে পার্টিসিপ্যাট না করবে, ততক্ষণ আমি তাদেরকে অপরাধী সাব্যস্ত করতে পারি না। পারি না তাদেরকে দমন ও হত্যাযোগ্য করে তুলতে।
কেন পারি না?
কারণ, আমেরিকার দাসত্ব করে তাদের তৈরি ন্যারেটিভের আলোকে মানুষকে জঙ্গি-উগ্রবাদী ট্যাগ মেরে দেওয়া, এগুলোও এক ধরনের উগ্রতা। অথচ, এই যে উগ্রতা, এটাও আমরা ইসলামপন্থীদের একটা অংশের দিকেই ইন্ডিকেট করে বলি।
০৪. আমেরিকা ও আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার ওপর ঈমানদার কিছু কিছু মানুষ, মাঝখানে কয়েক বছর তালেবানের মতো আল্লাহওয়ালা, সাম্রাজ্যবাদী কুফুরি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইকারী একটা মুজাহিদ গোষ্ঠীকেও উগ্রবাদী এবং সন্ত্রাসী ট্যাগ দিয়েছে।
এখন, একই ট্যাগ অনেকে ফিলিস্তিনের হামাসসহ মুজাহিদ বাহিনীগুলোকেও দেয়।
অথচ, এরা ঠিকই ইসরায়েল আর আমেরিকাকে এই ধরনের কোনো ট্যাগ দেয় না। এক্ষেত্রে আমেরিকা আর ইসরায়েল হচ্ছে এদের নতুন রব।
তারা কস্মিনকালেও তাদের রব আমেরিকা ও ইয়োরোপের অসন্তোষ কামনা করে না। সব সময় তাদের রব আমেরিকা-ইয়োরোপ যেভাবে আর যে কথায় সন্তুষ্ট হয়, তারা সব সময়ই সেভাবে আর সে ভাষাতেই কথা বলে।
এক্ষেত্রে, যদি নিরীহ কাউকেও উগ্রবাদী, জঙ্গি-সন্ত্রাসী উপাধি প্রদান করতে হয়, তারা সেটাতেও পিছপা হয় না। বরং সাগ্রহে আর সোতসাহে সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যায় সব সময়।
রেদওয়ান রাওয়াহা
২৬ মে, ২০২৫
Comments
Post a Comment