এক আলোকবাহী কবি
মক্কার উত্তপ্ত বাতাসে ধুলো উড়ছে। চারপাশে লোকজনের কোলাহল। কাবার পাশে একজন মানুষ নামাজ পড়ছেন। সেই মানুষটি— যাঁকে নিয়ে শহরজুড়ে অপবাদ, বিদ্বেষ, আর অজস্র মিথ্যাচার। যাঁকে কুরাইশরা বলছে—“জাদুকর”।
দাউস গোত্রের কবি ও নেতা তোফায়েল ইবনে আমর আদ-দাওসি (রা.) তখন মক্কায় এসেছেন। তাঁর আগমনের খবরেই সরগরম কুরাইশদের আঙিনা।
একজন তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন। চোখে উদ্বেগ, কণ্ঠে সতর্কতা—
“তোফায়েল! সাবধানে থেকো। এখানে এক লোক আছে— তার কথা জাদুর মতো, কবিতার মতো।
সে এমনভাবে কথা বলে, শুনলেই মানুষ নিজের বাপ-ভাই, স্ত্রী-সন্তান— সবকিছুই ভুলে যায়। তার কথা শুনবে না, এমনকি চোখে পড়লেও মুখ ফিরিয়ে নেবে।”
তোফায়েল (রা.) কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন।
রাতের আঁধারে তিনি কানে তুলো গুঁজে নিলেন, যেন কোনোভাবেই সেই “জাদুকরের” কথা তাঁর কানে না পৌঁছায়।
কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের চেয়ে অনেক সূক্ষ্ম।
সকালে তিনি কাবার পাশে এলেন। দূর থেকে দেখলেন, এক মানুষ নম্র ভঙ্গিতে সিজদায় লীন। মুখে কী যেন অদ্ভুত এক মায়াবী সুর।
সেই সুরটি হলো কুরআনের সুর। তুলো গুঁজে রাখা কানের ভেতরও যেন কুরআনের সেই মোলায়েম ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো।
তোফায়েল থেমে গেলেন। তাঁর মনে অসাধারণ এক প্রশ্ন উদয় হলো—
“আমার তো বুদ্ধি আছে, প্রজ্ঞা আছে। তাহলে আমি কেন অন্যের প্ররোচনায় প্রভাবিত হব? কেন নিজে শুনে বিচার করব না?”
তিনি ধীরে ধীরে কানের তুলো বের করে ফেললেন। শুনলেন কুরআনের তিলাওয়াত। আর তখনই— অজান্তে তার চোখ ভিজে উঠল।
নামাজ শেষে তিনি এগিয়ে গেলেন নবীর দিকে। বললেন—“হে মুহাম্মদ (সা.), লোকজন আমাকে আপনার কথা না শুনতে বলেছিল। আমি কানে তুলো গুঁজে রেখেছিলাম। তবুও কিছু শব্দ আমার কানে এসে পৌঁছেছে। সেগুলো অদ্ভুত, অজানা, অথচ প্রশান্তিতে ভরা। আপনি কি আমায় বলবেন, আপনি কী বলেন?”
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুখে এক চিলতে শান্ত ও মোলায়েম হাসি। তিনি কিছু আয়াত তিলাওয়াত করলেন। আল্লাহর বার্তা ব্যাখ্যা করলেন।
তোফায়েল (রা.) শুনলেন গভীর মনোযোগে। তাঁর চোখে তখন এমন আলো, যেন তিনি হঠাৎই জীবনের মানে আবিষ্কার করেছেন।
অতঃপর তিনি কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন—
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর রাসূল।”
এরপর বললেন— “হে আল্লাহর রাসূল (সা.), আমি আমার গোত্রে প্রভাবশালী। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন, যেন তিনি আমার জন্য এমন একটি নিদর্শন দেন— যা আমার দাওয়াতে সহায়ক হবে।”
রাসূল (সা.) দু‘আ করলেন।
ফিরে যাওয়ার পথে তোফায়েল (রা.) অনুভব করলেন— তাঁর কপালের মাঝখানে একটি উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠেছে। প্রদীপের মতো ঝলমল করছে।
তিনি ভয় পেলেন। বললেন—“হে আল্লাহর রাসূল, এই আলোর আভা মুখে নয়! এখানে থাকলে ওরা মনে করবে এটা তাদের বাপ দাদার ধর্ম ত্যাগ করার অভিশাপ। মানুষ যেন এটিকে অভিশাপ না ভাবে।”
তৎক্ষণাৎ আলো নেমে গেল তাঁর লাঠির মাথায়।
রাতের অন্ধকারে সেই আলোই হলো তাঁর পথপ্রদর্শক।
বাড়ি ফিরে প্রথমেই বললেন— “বাবা, দূরে থাকুন। আমি মুসলমান হয়েছি।”
বৃদ্ধ পিতা অবাক হয়ে বললেন— “তুমি যা মানো, আমিও তাই মানি, বৎস।”
এরপর স্ত্রীকে বললেন—“আমি মুহাম্মদের (সা.) ধর্ম গ্রহণ করেছি।”
স্ত্রী উত্তর দিলেন—“তবে আমিও তোমার ধর্ম গ্রহণ করব।”
এভাবে তারা পুরো পরিবারই ইসলাম গ্রহণ করলেন।
এরপর গোত্রের সবাইকে আহ্বান জানালেন। কিন্তু কেউই শুনল না। কেউ হাসল, কেউ উপহাস করল। হতাশ হয়ে, ব্যর্থমনোরথে তোফায়েল (রা.) আবার মক্কায় ফিরে এলেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে এসে বললেন—
“হে রাসূল (সা.), দাউস গোত্র আমার কথা শুনছে না! আপনি কি ওদেরকে অভিশাপ দেবেন?”
রাসূল (সা.) হাসলেন।
অতঃপর দুই হাত তুলে বললেন—“হে আল্লাহ, দাউস গোত্রকে হেদায়েত দিন।”
তোফায়েল (রা.) ফিরে গেলেন। ধৈর্য, নম্রতা ও বিশ্বাস নিয়ে দাওয়াত চালিয়ে যেতে লাগলেন।
বছর কয়েক পর— দাউস গোত্রের সত্তর-আশি পরিবার ইসলাম গ্রহণ করল। খায়বার যুদ্ধে তোফায়েল (রা.) তাঁদের নিয়ে যোগ দিলেন প্রিয় নবীর দলে।
এরপর এক সময় তিনি বৃদ্ধ হলেন।
বৃদ্ধ তোফায়েল ইবনে আমর আদ-দাওসি (রা.) এক রাতে অবাক করা এক স্বপ্ন দেখলেন। দেখলেন— “মাথা কাটা, মুখ থেকে এক পাখি উড়ে যাচ্ছে, এক নারী এসে তাঁকে নিজের জঠরে নিয়ে নিচ্ছে, আর তাঁর ছেলে উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁকে খুঁজছে।”
এই স্বপ্নের ব্যাখ্যায় তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন—
“আমি বুঝেছি— আমার শহীদ হওয়ার সময় এসে গেছে।”
এরপর ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শহীদ হলেন। আর তাঁর ছেলে আমর ইবনে তোফায়েলও শহীদ হলেন, ইয়ারমুকের প্রান্তরে।
রাতের আকাশে তখন মিটমিটিয়ে অগণন তারা জ্বলছে। হয়তো কোনো একটি তারা এখনও সেই আলোরই প্রতিফলন—যে আলো একদিন এই কবি ও নেতার হৃদয়ে জ্বলে উঠেছিল কাবার পাশে, কুরআনের সুরে।
তোফায়েল ইবনে আমর আদ-দাওসি (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়—
• সত্যের আহ্বানকে কখনও কান বন্ধ করে ঠেকানো যায় না; যে হৃদয় অনুসন্ধিৎসু, বিদ্বেষের বুদবুদ থেকে মুক্ত, আল্লাহ তার কানে পৌঁছে দেন নিজ বাণীর সুর।
• মানুষের কথায় নয়, বিবেকের আলোয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অন্যের ভয়, গুজব বা প্রচারণা যতই প্রবল হোক, সত্য নিজেকে চিনিয়ে দেয় সেই হৃদয়ের কাছে, যে হৃদয় সত্যের সন্ধানী।
• দাঈ ও দাওয়াতের ভাষা কখনও অভিশাপ নয়, হতে হয় কল্যাণ ও হেদায়েতের প্রার্থনায় ঘেরা। নবী (সা.) যেমন দাউস গোত্রের জন্য অভিশাপ নয়, হেদায়েতের দু‘আ করেছিলেন— সত্যিকারের দাওয়াতও তেমনই মমতা ও ধৈর্যের ভাষায় উচ্চারিত হতে হয়। মানুষের সংশোধন তো আর এমনিই এমনিই হয় না। তাই না?
• একজন মানুষও যদি সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করে, তবে তার আলো গোত্র থেকে গোত্রে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যেতে পারে।
• সবর ও ইস্তিকামাতের সাথে কাজ করলে স্রেফ একজন ব্যক্তিই আস্ত একটি জনপদকে আলোকিত করতে পারেন।
• যে আলো একবার অন্তরে জ্বলে ওঠে, তা ধারণ করতে হয় আমৃত্যু। ধারণ করতে হয়; শহীদের রক্তে, দাওয়াতের ধৈর্যে, আর ঈমানের স্থিরতায়। তাহলেই মরে গিয়েও বেঁচে থাকা যাবে চিরকাল।
~রেদওয়ান রাওয়াহা
১৩ অক্টোবর, ২০২৫
Comments
Post a Comment