এক নজরে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জীবনপরিক্রমা
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী— উপমহাদেশের প্রখ্যাত ওয়ায়েজ, লেখক, তাফসিরকারক, আলিমে দ্বীন ও রাজনীতিবিদ।
এমন ক্ষণজন্মা মহান মনীষী বাংলাদেশের জমিন খুবই কম জন্ম দিয়েছে। এখানে আমরা এই মহান মানুষটির জন্ম, শিক্ষাজীবন, পারিবারিক পরিচয়, ওয়াজ, রাজনীতি, কারাবরণ ও মৃত্যু পর্যন্ত পুরো জীবন পরিক্রমা একনজরে নিচে তুলে ধরব ইন শা আল্লাহ।
• জন্ম
২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ সালের ৭ রমজান পিরোজপুর জেলার জিয়ানগর (সাবেক ইন্দুরকানী) উপজেলার সাঈদখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা মাওলানা ইউসুফ সাঈদীও ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ এবং ফুরফুরা পীর সাহেবের খলিফা।
• তাঁর নাম :
ফুরফুরা শরীফের পীর হযরত মাওলানা আবু জাফর সিদ্দিকী আল-কোরাইশী আল্লামা সাঈদীর জন্মের পর তাঁদের পৈতৃক বাড়িতে আসেন। তিনিই মূলত তাঁর নাম “দেলাওয়ার” রাখেন।
পিতার নাম সাঈদীর সাথে তখন থেকে থেকে দেলাওয়ার নামটি যুক্ত করে তিনি হয়ে ওঠেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।
কিন্তু তখনও তাঁর পিতা-মাতা কিংবা দুনিয়ার কেউই জানত না, এই ছেলেটিই একদিন জগদ্বিখ্যাত একজন আলিমে দ্বীন হবেন। হবেন ইসলামি আন্দোলনের কিংবদন্তি এক সেনাপতি।
• বিবাহ, স্ত্রী ও সন্তানাদি :
তাঁর মহীয়সী স্ত্রীর নাম বেগম সালেহা খাতুন। -এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
তিনি চার পুত্রের জনক। তারা হলেন যথাক্রমে:
১. রাফিক বিন সাঈদী (বুলবুল)।
তাঁর চার ছেলের মধ্যে বড় ছেলে বাবার মতোই একজন আলিমে দ্বীন হিসেবে গড়ে উঠেছিলেন। তিনি তাঁকে নরসিংদী জামেয়া কাসেমিয়া মাদরাসায় পড়ান। সেখান থেকে কামিল পাশ করেন।
কিন্তু তাঁর সর্বাধিক প্রিয় সন্তান, মাওলানা রাফিক বিন সাঈদী বাবার ওপর এমন নিষ্ঠুরতম অপবাদ সহ্য করতে না পেরে ২০১২ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন।
২. শামীম বিন সাঈদী (দ্বিতীয় পুত্র, ও এবার পিরোজপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন) ।
৩. মাসউদ বিন সাঈদী (তৃতীয় পুত্র, পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান এবং বর্তমান পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য)।
৪. নাসিম বিন সাঈদী (কনিষ্ঠ পুত্র)।
• শিক্ষাজীবন :
ছারছিনা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ১৯৫৫ সালে দাখিল ১৯৫৭ সালে আলিম পাশ করেন। অতঃপর তিনি খুলনা আলিয়ায় ভর্তি হন। সেখান থেকেই একাডেমিক পড়াশোনার ইতি টানেন।
একাডেমিক পড়াশোনার পর ব্যক্তিগতভাবে আরও পাঁচ বছর অধ্যয়নে মশগুল থাকেন তিনি।
• ওয়াজ মাহফিলের আত্মনিয়োগ
ওয়াজের ময়দানে কিশোর সময় থেকেই বিচরণ তাঁর। শিক্ষকগণ তাঁকে মাহফিলে যাওয়ার সময় কখনও কখনও সাথে করে নিয়ে যেতেন এবং কয়েক মিনিট আলোচনার সুযোগ দিতেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি হিসেবে ১৯৬৭ সাল থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াজ ও তাফসিরের ময়দানে সক্রিয় হন।
তখন থেকেই বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপন, তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা, বিজ্ঞান ও সামাজিক জীবনের সাথে কুরআনের সুসংহত ব্যাখ্যা এবং মোহনীয় কণ্ঠের জন্য তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ বাংলাভাষী মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন।
• রাজনৈতিক জীবন ও সংসদ সদস্য
জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান : তিনি ১৯৭৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে রুকন শপথ নেন। পরবর্তীতে দলের মজলিসে শূরা, কর্মপরিষদ, নির্বাহী পরিষদএবং সর্বশেষ নায়েবে আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রথমবার এমপি :
১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন।
দ্বিতীয়বার এমপি:
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে পুনরায় একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
• কারাবরণ, বিচার ও কারাজীবন
প্রথম গ্রেফতার ও কারাবরণ:
আল্লামা সাঈদীর সাহসী আর সত্য উচ্চারণের জন্য, ইসলাম বিদ্বেষী শেখ মুজিবের সরকার তাঁকে ১৯৭৫ সালের ২৯ জুলাই রাষ্ট্র বিরোধী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করে।
১৫ আগস্ট মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি তখন মুক্তি লাভ করেন।
দ্বিতীয়বার গ্রেফতার :
সারাজীবন ধর্মপ্রচারক এই মহান মানুষটির বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন তরিকত ফেডারেশনের নেতা সৈয়দ রেজাউল হক ও নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলা করে।
অতঃপর ২০১০ সালের ২১ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার মামলায় গ্রেপ্তার হন তিনি।
পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়:
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে।
তাঁর বিরুদ্ধে এই অন্যায় রায় প্রদানের প্রতিবাদে এ দেশের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাই রাজপথে নেমে আসে। প্রায় ২০০ মানুষ রাজপথে জীবন দিয়ে শাহাদাত বরণ করেন।
সুপ্রিম কোর্টের রায় :
১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের রায় পরিবর্তন করে তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করেন।
১৩ বছরের বন্দিজীবন:
২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানত গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে দীর্ঘ ১৩ বছর বন্দি ছিলেন।
কারাবন্দি থাকা অবস্থাতেই ২০১২ সালে তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রফিক বিন সাঈদীকে হারান। হারান তিনি তাঁর মহীয়সী মাকেও।
• শাহাদাত
২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট কারাগারে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ঢাকার বিএসএমএমইউ (পিজি হাসপাতাল)-তে ভর্তি করা হয়। সেখানে খুনি হাসিনার গুণ্ডাদের বিষ প্রয়োগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪ আগস্ট ২০২৩ রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা কুরআনের পাখি, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে শাহাদাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। তাঁর সকল গুনাহ ক্ষমা করুন। আমিন।
~রেদওয়ান রাওয়াহা

Comments
Post a Comment