ক্ষমতার লড়াই: গণতন্ত্র যখন প্রতিহিংসার শিল্প

 




০১.

ক্ষমতার জন্য মানুষের লড়াই বহু প্রাচীন। রাজা-বাদশাহদের সাম্রাজ্য বিস্তার থেকে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের রাজনীতি— সব যুগেই ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে সংঘাত, ষড়যন্ত্র, হত্যা ও প্রতিহিংসার অসংখ্য উদাহরণ আছে।


কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্ষমতার মধ্যে এমন কী আছে, যার জন্য মানুষ কখনও কখনল নিজের মানবিকতা পর্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হয়, এমনকি দিয়েও দেয়?


মূলত ক্ষমতা শুধু শাসন করার অধিকার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সম্পদ, মর্যাদা ও অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ।


 মানুষ যখন ক্ষমতাকে নিজের পরিচয় ও অস্তিত্বের অংশ বানিয়ে ফেলে, তখন ক্ষমতা হারানো তার কাছে কেবল সাধারণ একটি পরাজয় থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে অপমান ও নিরাপত্তাহীনতার কারণ। 


ভিন্ন রাজনৈতিক দল কিংবা আদর্শ তখন প্রতিদ্বন্দ্বী আর প্রতিযোগী থাকে না, হয়ে ওঠে শত্রু। আর প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করলে তাকে পরাজিত করার চেয়ে নির্মূল করার আকাঙ্ক্ষাই প্রবল হয়ে ওঠে।


 ক্ষমতার এই প্রাচীন ও বিষাক্ত লড়াইকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল গণতন্ত্র। 


অস্ত্রের পরিবর্তে ভোট, যুদ্ধের পরিবর্তে নির্বাচন— ক্ষমতা পরিবর্তনের একটি সভ্য ও সুন্দর পথ তৈরি করার স্বপ্ন দেখিয়েছিল।


কিন্তু গণতন্ত্র ক্ষমতার সেই প্রাচীন লড়াইকে তো বিলুপ্ত করেইনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে এই লড়াইকে আরও অধিক বিকশিত করেছে।


আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতা এখন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে যেকোনো মূল্যে জেতার লড়াই হয়ে গেছে, তাই জনমত নিয়ন্ত্রণ, মানুষের আবেগকে কাজে লাগানো এবং প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা আধুনিক রাজনীতির নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।


গণতন্ত্রকে কিউট প্রমাণ করতে গিয়ে একের বিরুদ্ধে অন্যকে ধ্বংস করার ধ্বংসাত্মক মানসিকতাকে আড়াল করে স্রেফ ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট দলীয় সিস্টেমের ওপর দোষ দেওয়া হয়। বলা হয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা সুস্থ প্রতিযোগিতা ভালো জিনিস। 


হ্যাঁ, সুস্থ প্রতিযোগিতা ভালো জিনিস, এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বে গণতান্ত্রিক রাজনীতি (এমনকি ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডেও কি বর্তমানে) সুস্থ প্রতিযোগিতা আছে কিংবা হয়?


হয় না তো।


কেবল প্রতিহিংসা, শত্রুতা, বিরোধ, ঘৃণা, অপবাদ এগুলোই বাড়ে এবং বাড়ছে অনিবার্যভাবে।  


গণতন্ত্রের পক্ষে চোখ বন্ধ করে সাফাই গাওয়া মহামান্যরা বুঝে না যে, এখানে সমস্যা শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নয়; সমস্যা হলো, প্রতিদ্বন্দ্বিতার লক্ষ্য যখন প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা থেকে তাকে নিশ্চিহ্ন করার দিকে চলে যায়, সেটায়।


  কুৎসা রটানো, অপমান করা, অপবাদ দেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে জনসমক্ষে হেয় করা কি আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে ওঠেছে না?


কেন এগুলো আমাদের রাজনীতি কিংবা গণতান্ত্রিক রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে?


কারণ, মানুষ স্বভাবতই শক্তিশালী পজিশন থেকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল পজিশনে আসতে চায় না। 


তাই ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে আত্মসম্মানবোধ এবং নিরাপত্তাহীনতার ভয়ও জড়িয়ে যায়, সে কারণে রাজনীতি জনসেবার জায়গা থেকে সরে গিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে পরিণত হয়।


অথচ গণতন্ত্রের কেতাবি শিক্ষা অনুযায়ী এর সৌন্দর্য হওয়ার কথা ছিল ঠিক এগুলোর বিপরীত। 


এখানে ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতার বাইরে থাকা— দুটিই স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হবার কথা ছিল। 


জিতে গেলে নির্বাচন ভালো, হেরে গেলে কারসাজি করে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই অভিযোগগুলো আসার কথা ছিল না। 


কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে কী হচ্ছে? 


এগুলোই হচ্ছে। 


সত্য হলে তো গণতন্ত্র স্রেফ কেতাবি জিনিস, ফাংশনেবল না, আর মিথ্যা হলে তো গণতন্ত্র এসব মিথ্যা আর অপবাদকে প্রাতিষ্ঠানিক ও শৈল্পিক রূপ দিয়েছে।


গণতন্ত্র বলে— আজ যে শাসক, আগামীকাল সে বিরোধী হতে পারে। কিন্তু ক্ষমতার এই পালাবদলকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা আজ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক দলটির মধ্যে তৈরি হয়েছে? কোনো অভিযোগ ছাড়া? 


এই না থাকাটাও প্রমাণ করে যে, মূর্তির মতো গণতন্ত্রের একটি মৃত কাঠামো টিকে থাকলেও তার চেতনা দুর্বল।


০২.


ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় নয়, বরং ক্ষমতা হারানোর আতঙ্কে। মানুষ যখন ক্ষমতাকেই নিজের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে ফেলে, তখন ক্ষমতা দিয়ে কী করা হবে, সেই প্রশ্নও তার মস্তিষ্ক থেকে হারিয়ে যায়। তখন একমাত্র প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়— অর্জিত ক্ষমতা কীভাবে ধরে রাখা যাবে?


০৩.


গণতান্ত্রিক রাজনীতির এই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, এর প্রভাব কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এ লড়াই গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। 


রাজতন্ত্রে ক্ষমতার লড়াই প্রধানত রাজপরিবার, অভিজাত গোষ্ঠী কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রিক পক্ষগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। 


কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে দলীয় পরিচয় ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্কেও প্রবেশ করে।


 ফলে রাজনৈতিক বিরোধ কখনো কখনো গ্রামগঞ্জের অলিগলি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, ভাইয়ে ভাইয়ে, এমনকি বাপ-ছেলের মধ্যেও বিরোধ ও শত্রুতার জন্ম দেয়। রাজপরিবারের ক্ষমতার লড়াই পঞ্চগড়ের অজপাড়াগাঁয়ের সাধারণ মানুষের ঘরেও প্রবেশ করে।


ক্ষমতার চেয়ারে আসবে যেখানে শহুরে অভিজাত কোনো ব্যক্তি, সেখানে উত্তরপাড়ার কদ্রুদ্দিনও গিয়ে সেই অভিজাত ব্যক্তির পক্ষ নিয়ে নিজের প্রতিবেশীর ঘর পুড়িয়ে দেয়। 


নিজের বাইরে সাথে মারামারি করে খুনের আসামি বনে যায়। 


এসব কারণে গণতন্ত্রের সমালোচনা ভীষণ জরুরি হয়ে পড়ে।


 অথচ গণতন্ত্রের সমালোচনা করলেই ইসলামি আন্দোলনের নেতা নামধারী ব্যক্তি কিংবা ইকামতে দ্বীনের অনুসারী দাবিদার কিছু কর্মী ঝগড়াঝাটিতে জড়িয়ে পড়েন; সমালোচককে উগ্রবাদী কিংবা জঙ্গি হিসেবে ফ্রেমিং করার চেষ্টা করেন।


অথচ গণতন্ত্রের সমালোচনা করা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর মতো প্রাচীন দার্শনিকেরাও এই ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। 


কিন্তু আধুনিক ইকামতে দ্বীনের নামধারী ব্যক্তি ও দলের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ গণতন্ত্রের সমালোচনায় এতটাই তেতে উঠেন, এতটাই উগ্র ও অসহিষ্ণুতার সঙ্গে মোকাবিলা করেন যে, মনে হয় যেন গণতন্ত্র তাদের বাবা আর সেই বাবার সমালোচনা করাটা কোনো অপরাধ। 


তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়, গণতন্ত্র যেন রব্বুল আলামিন প্রদত্ত কোনো অনুপম ঐশী আদর্শ। আর সেই আদর্শ তাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ— যার সমালোচনা মানেই তাদের ওপর আক্রমণ।


কয়দিন আগে একজন মানুষ, যাকে খুব ভালো মনে করেছিলাম, যার সাথে আক্ষরিক অর্থেই আমার ভীষণ ভালো সম্পর্ক ছিল, কোনো দিন যার সাথে একটি ঝামেলা কিংবা ঝগড়াও হয়নি, সেরকম একটি মানুষকে দেখলাম বর্তমান দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন মজলুম আলিমে দ্বীন, শাইখ সালিহ আল-মুনাজ্জিদকে উগ্রবাদী ট্যাগ দিয়ে শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেলের কাছে প্রকাশ্যেই কানভারী করেছেন। 


অথচ শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল ওই অপবাদের মোটেও বিরোধিতা করেননি। অন্তত করেছেন বলে দেখা যায়নি, এমনকি এই মহান আলিমের ওপর অপবাদদাতা বদমাশ ব্যক্তিটিকেও দেখা যায়নি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে।


এখানে প্রশ্ন শুধু একজন আলিমকে অপবাদ দেওয়ার নয়; বরং ভিন্নমত ও নিজের চিন্তার বিরোধী কাউকে গ্রহণ কিংবা বর্জন অথবা মোকাবিলা করার পদ্ধতি নিয়ে। 


সম্মান ও যুক্তি দিয়ে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে কাউকে উগ্রবাদী আখ্যা দিয়ে কোণঠাসা করার এই মানসিকতা তো গণতন্ত্রের জন্যই তৈরি হয়েছিল। ঠিক না?


০৪.

তাহলে এতক্ষণের আলোচনার সামারাইজ করলে যা দাঁড়ায়, তা হলো— রাজতন্ত্রে শত্রুতা কিংবা ক্ষমতার জন্য রক্তারক্তি ছিল মূলত সমপর্যায়ের কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের সাথে। 

 

কিন্তু গণতন্ত্র ক্ষমতার সেই লড়াই আর প্রতিহিংসাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে।

 

সেই যুদ্ধ, সেই প্রতিহিংসা গ্রামগঞ্জের প্রতিটি অলিগলিতে পৌঁছে দিয়েছে। রাজপরিবারের লড়াইকে গ্রামে গ্রামে, ভাইয়ে ভাইয়ে, এমনকি বাপ-ছেলের যুদ্ধে পরিণত করেছে।

 

কিন্তু এখন গণতন্ত্রের সমালোচনা করলে ইসলামি আন্দোলনের নেতা নামধারী ব্যক্তি কিংবা ইকামতে দ্বীনের অনুসারী কর্মীরা কোমর বেঁধে ঝগড়াঝাটি করতে, উগ্রবাদী কিংবা জঙ্গি বলে ফ্রেমিং করতে চলে আসে।

 

অথচ গণতন্ত্র এমন একটা বিষয়, যার সমালোচনা নিতান্তই স্বাভাবিক।

 

এই সমালোচনা কি অ্যারিস্টটল কিংবা প্লেটো করেননি?

 

কিন্তু আধুনিক ইকামতে দ্বীনের নামধারী ব্যক্তি ও দলের নেতাকর্মীরা এই সমালোচনাটাও সহ্য করতে পারে না।

 

গণতন্ত্রের সমালোচনায় এরা এত উগ্রভাবে ক্ষেপে যায় যে, মনে হয় গণতন্ত্র এদের বাবা।

 

এই যে অসহিষ্ণু আর উগ্র মনোভাব, এই যে খুনে মানসিকতা, মুসলিম হিসেবে অন্য মুসলমানকে হত্যার বৈধতা উৎপাদন—এগুলোর পেছনে গণতন্ত্রও ইন্ধন দেয়। খুব মজবুতভাবেই দেয়।

 

এবং এটাও যে এক রকমের মজবুত খারিজিয়াত, এই মডার্ন খারেজিরা তা বুঝতেও অক্ষম।


~রেদওয়ান রাওয়াহা

১৬. ১০. ২৬

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানিরা কি সত্যিই আমাদের মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চেয়েছিলো?

স্বপ্নে হলেও এসো একবার

"আলিমরা কি সবকিছুকেই হারাম হারাম ফতোয়া দেয়?"